
একজন সাংবাদিক যখন হাতে কলম, কাঁধে ক্যামেরা কিংবা মাইক্রোফোন নিয়ে মানুষের কাছে ছুটে যান, তখন তিনি শুধু নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন না- তিনি সমাজের চোখ হয়ে ওঠেন, মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি নীরব অথচ শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠেন। সেই সাংবাদিকই যদি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন শুধু একজন ইসমাইল হোসেনকে নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো- এই সমাজে সত্য বলার অধিকার কতটা নিরাপদ?
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক ইসমাইল হোসেন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ, মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে দাবি জানাচ্ছি- ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হোক। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে তদন্তে প্রমাণিত হবে, তাদের কোনো পরিচয়, প্রভাব, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ক্ষমতার বলয় যেন আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারে।
একজন সাংবাদিকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন হয়তো কয়েকদিন বা কয়েক মাস পর মুছে যাবে। কিন্তু সেই আঘাতের আতঙ্ক যদি তার কলমে ঢুকে পড়ে, তার ক্যামেরায় ঢুকে পড়ে, তার বিবেকের ওপর ভয় হয়ে বসে যায়- তাহলে ক্ষতিটা আর ব্যক্তিগত থাকে না। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
কারণ সাংবাদিক ভয় পেলে মানুষও ভয় পায়।
সাংবাদিক চুপ হয়ে গেলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠও দুর্বল হয়ে যায়।
সাংবাদিক সত্য প্রকাশে পিছিয়ে গেলে মিথ্যা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আর মিথ্যা যখন শক্তিশালী হয়, তখন দুর্বল মানুষের কান্না শোনার মতো কেউ থাকে না।
এ কারণেই সাংবাদিকের ওপর হামলা বা নির্যাতনকে কোনোভাবেই নিছক ব্যক্তিগত বিরোধ, কথাকাটাকাটি কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংবাদকর্মীর ওপর হামলা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। এটি মানুষের জানার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করার আশঙ্কা তৈরি করে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই ধরনের ঘটনা কখনোই স্বাভাবিক হতে পারে না।
আজ চন্দ্রগঞ্জে একজন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আগামীকাল অন্য কোনো সাংবাদিক যদি একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন তিনি হয়তো ভাববেন- ‘সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি আমার ওপরও হামলা হয়, আমাকে রক্ষা করবে কে?’
এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
প্রশাসনকে দিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিতে হবে।
এবং সর্বোপরি, সমাজকে দিতে হবে।
আমরা মনে করি, কোনো সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করলে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কোনো সংবাদ ভুল হলে তার প্রতিবাদ করার আইনগত পথ আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দিতে পারে, প্রতিবাদলিপি দিতে পারে, প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু সংবাদ পছন্দ হয়নি বলে সাংবাদিককে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, লাঞ্ছিত করা কিংবা শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা কোনোভাবেই সভ্য সমাজের স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে না।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সাংবাদিককে চুপ করানোর অধিকার কারও নেই।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার অধিকার কারও নেই।
অপরাধের সঙ্গে যারই সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হোক- তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতেই হবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় এখানেই- কোনো ঘটনার পর যদি তদন্ত ঝুলে থাকে, মামলা হলেও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকে কিংবা প্রভাবশালীদের ছায়ায় প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়ে যায়, তাহলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। তখন শুধু একজন সাংবাদিক নয়, গোটা সাংবাদিক সমাজের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
আর নিরাপত্তাহীন সাংবাদিকতা কখনো স্বাধীন সাংবাদিকতা হতে পারে না।
আমরা তাই চন্দ্রগঞ্জের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো প্রতিহিংসা চাই না; চাই না কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হোক। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
তদন্ত হোক নিরপেক্ষভাবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হোক। প্রয়োজনীয় ভিডিও ফুটেজ, ছবি, মোবাইল ফোনের তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট আলামত যাচাই করা হোক। সাংবাদিক ইসমাইল হোসেনের বক্তব্য এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্রও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হোক। তদন্তে যার বিরুদ্ধে যে মাত্রার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
কারণ বিচার মানে শুধু কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়; বিচার মানে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।
একজন সাংবাদিক যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন, তখন তার পেছনে শুধু একটি সংবাদপত্র বা একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থাকে না- থাকে সমাজের অসংখ্য মানুষের জানার অধিকার। তার হাতে থাকা ক্যামেরাটি শুধু ছবি ধারণ করে না; ইতিহাস ধারণ করে। তার কলম শুধু খবর লেখে না; সময়ের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করে।
সেই কলমকে যদি আঘাত করা হয়, সেই ক্যামেরাকে যদি ভয় দেখানো হয়, সেই সাংবাদিককে যদি রাস্তায় অপমানিত বা নির্যাতিত হতে হয়- তাহলে মনে রাখতে হবে, আঘাতটি কেবল একজন মানুষের ওপর পড়েনি।
আঘাতটি পড়েছে আমাদের বিবেকের ওপর।
আঘাতটি পড়েছে মানুষের অধিকারের ওপর।
আঘাতটি পড়েছে আইনের শাসনের ওপর।
আঘাতটি পড়েছে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর।
আর সেই আঘাতের প্রতিধ্বনি একদিন সমাজের প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে পারে।
আমরা লক্ষ্মীপুরকে এমন একটি জেলা হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে সাংবাদিক নিরাপদে কাজ করবেন, সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে কথা বলবেন এবং প্রশাসনের দরজা থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত। অপরাধী অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবে- তার রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থবল, সামাজিক প্রভাব কিংবা কোনো গোষ্ঠীর ছায়া তাকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলতে পারবে না।
আজ প্রয়োজন কঠোর কিন্তু ন্যায়সংগত অবস্থান।
প্রয়োজন দৃশ্যমান তদন্ত।
প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
প্রয়োজন সাংবাদিকদের নিরাপত্তার কার্যকর নিশ্চয়তা।
কারণ একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা মানে শুধু একজন মানুষের নিরাপত্তা নয়—এটি সমাজের সত্য বলার অধিকারকে নিরাপদ রাখা।
আমরা আর এমন কোনো সকাল দেখতে চাই না, যেদিন সংবাদপত্রের পাতায় লিখতে হবে‘ সত্য লিখতে গিয়ে আরেক সাংবাদিক আক্রান্ত।’
আমরা আর এমন কোনো রাত চাই না, যখন একজন সংবাদকর্মী মাঠে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসবেন কি না- এই আতঙ্কে তার স্বজনদের রাত কাটাতে হবে।
সাংবাদিকের কলম যেন ভয়ে থেমে না যায়।
ক্যামেরার লেন্স যেন আতঙ্কে বন্ধ না হয়ে যায়।
সত্য যেন ক্ষমতার কাছে পরাজিত না হয়।
চন্দ্রগঞ্জের ঘটনায় তাই স্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন- সাংবাদিককে আঘাত করে সত্যকে থামানো যাবে না।
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অপরাধী যে দলের, যে মতের, যে গোষ্ঠীর কিংবা যে পরিচয়েরই হোক- আইনের সামনে তাকে দাঁড়াতেই হবে।
কারণ রাষ্ট্র যদি সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, মানুষ সাহস পায়।
আর রাষ্ট্র যদি অন্যায়ের সামনে নীরব থাকে, অন্যায় আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
আজ একজন সাংবাদিকের শরীর থেকে যে রক্ত ঝরেছে, সেটিকে শুধু একজন মানুষের রক্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই রক্ত আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রশ্ন করছে- সত্য বলার অধিকার কি নিরাপদ? সাংবাদিক কি নিরাপদ? সাধারণ মানুষ কি নিরাপদ?
এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়- আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগের মাধ্যমে দিতে হবে।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
সত্য প্রকাশের পথ নিরাপদ করুন।
অপরাধীকে আইনের আওতায় আনুন।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন।
নইলে একদিন হয়তো আমরা সবাই কথা বলার অধিকার হারাব- আর তখন চারপাশে থাকবে শুধু নীরবতা, ভয় আর অন্ধকার।
লেখক,
মো: কামাল উদ্দিন হাওলাদার
সাবেক সভাপতি, লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাব
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক রূপসী লক্ষ্মীপুর।

























